Monday, July 21, 2025

শিশু শিখছে আপনাকে দেখেই আপনি কী শিখাচ্ছেন

 

বাচ্চারা খুব মনোযোগী পর্যবেক্ষক। তারা ছোট থেকেই পরিবারে যাদের দেখে, তাদের অনুসরণ করে বড় হয়ে ওঠে। মা-বাবা যা করেন, সন্তান সেটিই শিখে নেয় – কথায় নয়, বরং চোখে দেখা আচরণ থেকেই ওরা সবচেয়ে বেশি শিখে।

অনেক সময়েই আমরা সন্তানের পড়া নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকি, তাকে শিখতে বাধ্য করি। কিন্তু নিজেরাই তখন টিভি দেখি বা ফোনে ডুবে থাকি। আপনি যদি নিজে পড়ে না বসেন, তাহলে কি realistically শিশুর কাছ থেকে তা আশা করা যায়?

এখন আপনি ভাবতেই পারেন - এই বয়সে আমারই বা পড়ার সময় কোথায়? সংসারের এত কাজ! কিন্তু বিশ্বাস করুন, ইচ্ছা থাকলে একটু সময় বের করাই যায়। প্রতিদিন কিছুটা সময় নিজের পছন্দের বইয়ের সঙ্গে কাটান – হোক সেটি উপন্যাস, জীবনী, ধর্মীয় বই, কবিতা কিংবা অ্যাডভেঞ্চারের কাহিনী।

আপনি যদি এক কোণায় বসে পড়ে থাকেন চুপচাপ, দেখবেন আপনার ছোট্ট সাথীটাও পাশে বসে পড়তে শুরু করেছে। আপনি আচরণে যে উদাহরণ তৈরি করছেন, তা ওর শেখার সবচেয়ে বড় উপায়।

সন্তানকে সবসময় একাডেমিক বই হাতে ধরিয়ে দেবার দরকার নেই। বরং রঙিন ছবি-তুলে সাজানো গল্পের বই, ফ্যান্টাসি, সায়েন্স ফিকশন কিংবা গোয়েন্দা গল্প দিন। এ ধরনের বই বাচ্চার কল্পনাশক্তি ও যৌক্তিক চিন্তার বিকাশে দারুণ সহায়ক।

অনেকে ভাবেন রূপকথা বা সায়েন্স ফিকশন "অপ্রয়োজনীয়" বা "অপ্রাসঙ্গিক" বই। ভুল ধারণা! এগুলোর মাধ্যমে শিশু শেখে সমস্যা সমাধানে নতুন দৃষ্টিভঙ্গী ব্যবহার করতে। আর যদি শুরুতেই তাকে হাতে তুলে দিন নোট গাইড, তাহলে তার চিন্তাশক্তি বিকশিত হওয়ার সুযোগই আর থাকে না। গাইডে সাজানো উত্তর মুখস্থ করতে করতে ওর মন পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।

বাচ্চাকে ভাবতে শেখাতে হবে, প্রশ্নের উত্তর যেন নিজে খুঁজে পায়। পাঠ্যবইয়ের প্রতিটি অনুশীলন করার সময় নিজের মতো করে উত্তর খোঁজার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। গাইড মুখস্থ করানো শিশুকে কেবল মুখস্থ যন্ত্র বানিয়ে ফেলে – কিন্তু একজন স্বাধীন চিন্তাশীল ব্যক্তি তৈরি হয় না।

অন্যদিকে, যদি সে পড়ে মজার কোনো গোয়েন্দা গল্প কিংবা অ্যাডভেঞ্চার, তাহলে সমস্যার মধ্যে আনন্দ খুঁজে পাবে। আর এ ধরনের পাঠই তার বুদ্ধি আরও ধারালো করে তুলবে। তখন সে পড়াশোনার মূল বিষয়গুলোও নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে ভাবতে শিখবে।

শিশুর মস্তিষ্ককে আরও সক্রিয় করতে পড়াশোনার আগে কিছু মস্তিষ্ক চর্চার খেলা দিন – যেমন শব্দখেলা, সুডোকু ইত্যাদি। দৈনিক পত্রিকাগুলোতে এগুলো নিয়মিত আসে। প্রচুর ভুল করবে, সময়ও লাগবে, হয়তো সঠিক সমাধানও করতে পারবে না – তবু এই চেষ্টা তাকে চিন্তাশীল হতে, মনোযোগ বাড়াতে সহায়তা করবে।

আপনি নিজেও এসব খেলায় অংশ নিন। এতে আপনার নিজের মস্তিষ্কও সচল থাকবে এবং শিশুকে শেখাতে পারবেন সহভাবে। প্রতিপ্রতিদিন রিলস আর সোশ্যাল মিডিয়াতে সময় নষ্ট না করে, একটু সময় নিজের মানসিক প্রশান্তি আর বিকাশে দিন। সুডোকু বা শব্দছক দিয়ে আপনার মনোযোগ বাড়ুক, চিন্তা পরিষ্কার হোক।

যখন আপনার সন্তান কোনো শব্দ বুঝবে না, আপনি তাকে বুঝিয়ে দিন। গল্প করে বোঝান, উদাহরণ দিন। আপনি না জানলে সার্চ করে শিখে নিন, তারপর সহজভাবে ওকে জানান। কিন্তু মনে রাখবেন – "নোট গাইড" নয়, বরং নিজের চিন্তাশক্তি দিয়েই ওকে সঠিক উত্তর খুঁজতে শেখান।

হয়তো আপনি এখন বলবেন – "আমার সন্তান গাইড পড়ে অনেক ভালো ফল করেছে!" আমিও বলি – মুখস্থ করেই যদি কেউ পরীক্ষায় ভালো ফল করে, তা তাকে প্রকৃত মেধাবী প্রমাণ করে না। একটি সার্টিফিকেট হয়তো পাওয়া যাবে, কিন্তু জীবন ও কর্মক্ষেত্রের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হলে দরকার ব্যাপক জ্ঞান ও তার প্রয়োগের দক্ষতা।

এই দক্ষতা আসে প্রচুর বই পড়া, নিবন্ধ পড়া, নিউজ পড়া, পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করার অভ্যাস থেকে।

তাই, প্রথম ধাপে শিশুকে কেমন বই দেবেন? কেবল স্কুলের রুটিন পড়া নয়, আগে দিন গল্পের বই। যে বই সে পড়ে আনন্দ পায়, চিন্তা করে, নতুন কিছু জানে।

এখন থেকেই আপনি নিজে বই পড়ার জন্য সময় বের করে সন্তানকে পথ দেখান। দেখবেন, তাকে আর জোর করে পড়াতে হবে না – নিজেই উৎসাহ নিয়ে বইয়ের জগতে হারিয়ে যাবে।


শেয়ার করুন

Author:

Etiam at libero iaculis, mollis justo non, blandit augue. Vestibulum sit amet sodales est, a lacinia ex. Suspendisse vel enim sagittis, volutpat sem eget, condimentum sem.

0 coment rios: